দিন প্রতিদিন বিশেষ

দশমী বিশেষ  


। দশমীতেই শুরু দেবীপক্ষের ।



   কাজল ভট্টাচার্য ,কলকাতা


(শেষদিনের দুর্গাপুজো। বাঙালির মেগা ইভেন্ট। সাজসজ্জা খাওয়াদাওয়া সবকিছুই হলো। শেষপাতে একটু প্রেম না হলে জমে নাকি? আজ সেরকমই এক ঘটনা...)


দুর্গাপুজার দশমী হলেও, সেদিনই কারুর দেবীপক্ষের শুরু। 
পুজোর শেষদিনের ভাঙা হাট। কেমন একটা বিবর্ণ ব্যাপার। একে একে সবাই এসে জুটতো আড্ডায়। ভিড় জমতো মন্ডপ লাগোয়া চা দোকানে। মন্ডপের সানাইয়ে রাগ টোড়ি। বিসমিল্লার বিষাদের ধুন। মনটা কেমন উদাসী হয়ে যেত। 

দশমীর দুপুরে আড্ডা ভাঙার পরেই সব বন্ধুরা মিলে প্যান্ডেলে ঢুকতো। 
সেদিনই অনেকের প্রথম দেবীদর্শন। সপ্তমী, অষ্টমী বা নবমীতেও মন্ডপে গেছে ঠিকই। একঝলক ঠাকুরের দিকে তাকিয়েছিলও। কেউ হয়ত মা দুর্গাকে দেখেছে, তাঁর ছেলেপুলেকে দেখা হয়নি। ডেকোরেশনটা খুঁটিয়ে দেখতে না দেখতেই কোনও বন্ধু হাক পেড়েছে। আবার কেউ বাড়ির পুজোর থালাটা ভলেন্টিয়ারের কাছ থেকে নিয়েই চলে এসছে। আড্ডার একটি মুহূর্তও অপচয় করা যাবে না। আবার মৃন্ময়ীকে দেখতে গিয়ে চিন্ময়ীকে দেখে ফিরেছিল, এমনটাও আকছার হতো। মা দুর্গাকে দেখতে গিয়ে চোখ চলে গেছিল লক্ষ্মী সরস্বতীর দিকে। তারা কেউই দুর্গা মায়ের কন্যা না। ওপাড়ার দুর্গা কাকিমার দুই মেয়ে। দেখতে দেখতে ডাগর- ডোগর হয়ে গেছে।






এ কদিন সবাই ব্যস্ত ছিল আড্ডা মারতেই। প্যান্ডেলের ভিড়ের দিকে চোখ ঘুরলেও, মন যায়নি। আর ওই ভিড়ে কাউকে আলাদা করেও চেনা যায় না। সাজগোজ করে সব মেয়েই ফুলকুমারী। দশমীর সকালই প্রশস্ত। ফাঁকা মন্ডপে সবাই চোখে পড়ে। এপাড়ার বুচি, ওপাড়ার টেপি সবাইকে। কিন্তু চোখে পড়লেই বা কী আর না পড়লেই বা কী? তখনতো আর মোবাইল ছিলো না। তবু তার মধ্যেই কথা হয়ে যেত। চোখে চোখে। সাহসীরা হয়তো দু'পা এগিয়ে যেত।
- কেমন আছে কাকিমা?
- ভালো। পরশু অঞ্জলি দিতে এসেছিলতো।
- তাই নাকি, খেয়াল করিনি। অনেকদিন দেখিনি কাকিমাকে।
- আমরা তোমাকে দেখেছিলাম।
কাকিমার খবর হলো, কাকুর খবর না নিলে হয়? তখন বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ডের জমানা আসেনি। বাড়ি ঢুকতে লাগতো কাকু, কাকিমার পাসপোর্ট। আর কাকিমার মন জয় করতে পারলে তো কাকিমার মেয়ে ফাউ। একথা সেকথার মধ্যেই মেয়ে জানিয়ে দিলো, মায়ের সঙ্গে সিঁদুর খেলা দেখতে আসবে। তারপরেই জানতে চাইলো- তুমি বিসর্জনে যাবে না? 

একজন যখন দুর্গা কাকীমার সরস্বতী বা লক্ষ্মীমেয়ের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত, অন্যেরা তখন মনোযোগ দিয়েছে দশমীর দেবীদর্শনে। সেই দেখার মধ্যে ভক্তি কতটা থাকতো, তা নিয়ে ভক্তজনেরা প্রশ্ন তুলতেই পারতেন। তবে সেই দেবীদর্শনের নিষ্ঠা, আন্তরিকতার একশো ভাগ খাঁটি। দেবীর নিবিড় দর্শন। চোখের সামনে অসাধারণ রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে দেবী। মৃৎশিল্পীদের কল্পনায় দেবী এখন আবির্ভূতা হন মানবীরূপে। সুঠাম সুন্দরী। যে মৃৎশিল্পীর মন আর হাতের যুগলবন্দি যতো স্বপ্নময়, তার সৃষ্টিও ততই নজরকাড়া রূপসী। হাঁ করে দেখতে হয় সেই রূপের সম্ভার। 




একচালা দেবীর সৌন্দর্য আলাদা। ঘরোয়া ছাঁদের আটপৌরে দেবী। আপাদমস্তক আভিজাত্যে মোড়া। মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই চোখ নামিয়ে নিতে হয়। মাথা ঝুঁকে আসে। শিল্পসৃষ্টির দিক থেকে ওই আদি দেবী মূর্তিই সম্ভবত আধুনিক। দেবীচরিত্রের সঙ্গে ভীষন মানানসই ওই তেজদীপ্ত রূপ। আধুনিক দেবীমূর্তিতে শুধুই নারীসৌন্দর্য , আদি দেবীমূর্তিতে মহামায়ার দিব্য মাতৃরূপ।
দেবীর বিদায়লগ্নে ওই একরাশ সুন্দরের সামনে দাঁড়িয়েও যার মন কেমন করতো না, তার আদৌ মন ছিলো কিনা সন্দেহ হতো।

পুরোহিতমশাই একসময় সবাইকে হাতের ইশারায় ডেকে মাথায় পুজোর ফুল ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করতেন। হাতে সন্দেশ প্রসাদ দিতেন। তারজন্য দক্ষিণা দিতে হতো না। বামপন্থী বন্ধুদের অবশ্য তাতেও আপত্তি। "পুজো প্যান্ডেলের সামনে বসে বই বিক্রি করতে নীতিতে বাঁধে না, আর পুজোয় আপত্তি।" খোটাটা সবসময় নির্বিবাদে হজম করতো তা নয়। "পুজো করা আর বই বিক্রি করা এক না।"

"মনে রেখো কিন্তু," আঙুলে শাড়ির আঁচল গোটাতে গোটাতে বললো সেই মেয়ে। "সিঁদুর খেলা দেখতে আসবো। বিসর্জন দেখে বাড়ি ফিরবো।" বলতে বলতে দুর্গা কাকিমার মেয়ের বেনী দুলিয়ে বিদায়। যেতে যেতে পেছন ফিরে আরও একবার তাকানো- তুমি এসো কিন্তু। ওই আমন্ত্রণের গভীর বাণী আর কেউ শুনতে পেলো না, একমাত্র ওই বন্ধু ছাড়া। 

দশমীর দিনেই তার দেবীপক্ষের শুরু।

মন্তব্যসমূহ