২০২১ এর ভোটের বামেদের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে রাজদর্শী রায়ের বিশেষ কলম

 


  ।। যুক্তির পাহাড় গড়তে সিপিএমই সেরা ।।








 রাজদর্শী রায়, কলকাতা, ৪ মার্চ 


সয়ফুদ্দিন চৌধুরীর কথা মনে পড়ে? 
সিপিএমের প্রয়াত কাটোয়া সাংসদ। সুবক্তা। ক্ষুরধার যুক্তি তর্কের কোনও অভাব ছিলো না। তাই প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় কখনও একটিও কটু শব্দের ব্যবহার দরকার হতো না।
প্রথম মার্কসবাদী নেতা কাটোয়ার সফি। তিনি আজ থেকে একুশ বছর আগে ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যতের ছবিটা দেখতে পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাক সিপিএম। সেদিন সয়ফুদ্দিনের কথা শুনে, 'তেড়ে মেরে ডানন্ডা করে দেব ঠান্ডা' বলে তেড়ে গেছিলেন সিপিএমের আদি অকৃত্রিম ত্রয়ী- প্রয়াত হরকিষন সিং সুরজিত, প্রকাশ কারাট, আর অবশ্যই সীতারাম ইয়েচুরি। সয়ফুদ্দিনের গায়ে সিলমোহর দেগে দেওয়া হয়েছিল কংগ্রেসের দালালের।



গত রবিবারের ব্রিগেডে সেই সীতারাম ইয়েচুরিকেই দেখা গেল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী, আবদুল মান্নানদের সঙ্গে একমঞ্চে সুর মেলাতে। দারুণ খোশমেজাজে ছিলেন বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, মহম্মদ সেলিমরা।
এরপরের ইতিহাসটুকু সবার জানা। ২০০০ সালের ৩ অক্টোবর। সিপিএমের তরফ থেকে জানানো হয়েছিল, দলের সদস্যপদ থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে সয়ফুদ্দিন চৌধুরীর নাম।

এবার আরও একধাপ এগিয়ে, একুশে নির্বাচনের সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি ফুরফুরা শরিফের পিরজাদার সঙ্গে হাত ধরাধরি করে হাঁটতেও কোনও সঙ্কোচ বোধ করলেন না বিমান বসু, ইয়েচুরিরা। চেতলার তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক ফিরহাদ হাকিমের মন্তব্য, বাম কংগ্রেস জোটের ক্রাচ আব্বাস সিদ্দিকি।

রবিবারের ব্রিগেডে আব্বাসকে সিপিএম কর্তাদের আলিঙ্গনের ছবি দেখে পুরনো বামপন্থীদের অনেকেই যেমন চমকে উঠেছিলেন, ঠিক তেমনই সেদিন তাঁর দীক্ষাগুরু জ্যোতি বসুর কথায় চমকে উঠেছিলেন তৎকালীন পরিবহনমন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী। দিনটা ছিল ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর ২০। বসু বলেছিলেন, 'সুভাষের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।' 
মাথা খারাপ হওয়ার কারণটা কী? কারণটা হলো, সুভাষ তারাপিঠে তারাদর্শনে গেছিলেন। সেখানে আবার দুটি জবা ফুল, ৫০১ টাকা, শাড়ি দিয়ে দেবীবন্দনা সেরে জয়ধ্বনি দেন 'জয় তারা'। সুভাষ চক্রবর্তীর এহেন ধর্মে মতিগতি দেখে রীতিমত হইচই পড়ে যায় দলের অন্দরমহলে। বেপরোয়া সুভাষবাবু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি প্রথমে একজন হিন্দু, পরে ব্রাহ্মণ। তারও পরে মার্কসবাদী। তবে জ্যোতি বসুর ওই মন্তব্যে রীতিমতো আহত হয়েছিলিন সুভাষ। দলের কাছে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, 'মাথাই যখন খারাপ, তখন দল বহিষ্কার করছে না কেন?'


আজ দলকে সরাসরি প্রশ্ন করতে পারে, এমন ক্ষমতা নেই আলিমুদ্দিনের নেতাদের। গত এক দশক ধরে দল ক্ষয়রোগে ভুগেই চলেছে। কংগ্রেসের হাত ধরে সেই রোগের নিদান খুঁজেও খুব একটা লাভ হয়নি। আর তা হবেই বা কী করে? দশকের পর দশক ধরে অপুষ্টিতে ভুগে চলেছে কংগ্রেসেও। তাই এবার ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা আব্বাস সিদ্দিকিকে নিয়ে মাত্রাছাড়া উৎসাহ দেখালেন মহম্মদ সেলিম, সূর্যকান্ত মিশ্র, বিমান বসু, আবদুল মান্নানরা। 'ডুবতে থাকা বাম কংগ্রেস খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে,' বলছেন ফুরফুরা শরিফের পরিচিত মুখ ত্বহা সিদ্দিকি। তাঁর মতে, একটা বাচ্চা ছেলের হাত ধরে বাঁচার চেষ্টা চালাচ্ছে জোটের অন্য দুই শরিকদল।

নিজের পুরনো অভিজ্ঞতায়, পশ্চিমবঙ্গের এই নয়া জোটে সিঁদুরে মেঘ দেখতে পেয়েছেন স্বনামধন্য লেখিকা তসলিমা নাসরিন। টুইটে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী, 'ওদের সহবাসের ফলে বিজ্ঞানী জন্ম নেয় না, বরং জিহাদি জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।' 
আর ওই জিহাদির চাপ কেমন, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে কেরলের পিনারাই বিজয়ন সরকার। রাজ্যের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নিয়ে মালাবার রাজ্য তৈরির দাবি তুলেছে সুন্নি স্টুডেন্টস ফেডারেশন। এমনকি হুমকিও দিয়ে রেখেছে, দাবিপূরণ না হলে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের ধাঁচে সংগ্রামে নামা হবে।

তবে জেহাদিদের চাপের কাছে মাথা নোয়ানোর পুরনো অভ্যাস আছে বঙ্গ সিপিএমের। ২০০৩ সালের ২৮ নভেম্বর, পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তসলিমার বই 'দ্বিখণ্ডিত'। পরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য স্বীকার করেন, '...মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে (ওই সিদ্ধান্ত নিতে) বাধ্য হয়েছিলাম।" নিষেধাজ্ঞা যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আশঙ্কাতেই, সেকথা স্বীকার করেছিলেন সিপিএমের তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাসও। 



তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছিলেন বিমান বসু। জেহাদিদের শায়েস্তা করার বদলে তাঁর বিবৃতি ছিলো, 'তসলিমার থাকা নিয়ে শহরে অশান্তি হলে, তাঁর কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়াই উচিত।' ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর, দিনের আলো ফোটার আগেই নিরাপত্তা রক্ষীরা অন্যত্র সরিয়ে দেয় তসলিমাকে। বাংলা ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে ভারতকে বিদায় জানিয়েছিলেন লেখিকা।

শাসক বদলালেও ছবিটা বদলায়নি পশ্চিমবঙ্গের। 
পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের ফতোয়ায়, ২০১২ কলকাতা বইমেলায় বাতিল হয়ে যায় তসলিমার বই 'নির্বাসন' প্রকাশের অনুষ্ঠান। ২০১৩ জানুয়ারিতে কলকাতায় পা রাখতে পারলেন না সলমন রুশদি। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্তা জানিয়েছিলেন, রুশদিকে আসতে মানা করা হয়নি। পরিস্থিতির কথা জানাতে তিনি নিজেই ওই সফর বাতিল করেন। কারণ সেই একই, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ভয়।




পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে সরাসরি ধর্মকে জড়িয়ে ফেলার অভিযোগ তুললেন তৃণমূলের পোড় খাওয়া নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায়। পিরজাদা আব্বাসের সঙ্গে বাম কংগ্রেসের জোট বাঁধার ঘটনায় তাঁর অভিযোগ, জাতপাতের রাজনীতিতে এবার নাম লেখালো কংগ্রেস, বামপন্থীরাও। তবে ঘটনায় পরিষ্কার, বাম কংগ্রেস জোটে আব্বাসকে শরিক করার ব্যাপারে প্রথম থেকেই খুশি হতে পারেননি কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী। ওদিকে আশঙ্কার আরও একটি কারণ আছে। আব্বাসের সঙ্গে প্রথম যাঁর জোট বাঁধার কথা হয়েছিল, তিনি হায়দরাবাদের দল মিমের প্রাণপুরুষ অসদুদ্দিন ওয়েসি। সেই জোটের সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন থেকে গেছে।

মেজাজের ঝাঁজে পিরজাদা যে বেপরোয়া, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন জীবনের প্রথম ব্রিগেডেই। তবে সুবিধা একটাই, রেখেঢেকে কথা বলার ধার ধারেন না আব্বাস সিদ্দিকি। একদিকে খোলাখুলি সব আসনে বামপন্থীদের সমর্থন, অন্যদিকে আর এক জোটসঙ্গী কংগ্রেসকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়ে বসেন আব্বাস। আবার রাজ্যের শাসকদলের নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শূন্যে নামিয়ে আনার সতর্কবাণী। প্রশ্ন একটাই, কোন উৎস থেকে জন্মলগ্ন থেকেই এত শক্তিসঞ্চয় করে ফেললেন পিরজাদা?

 

ইন্ডিয়েন সেকুলার ফ্রন্ট যে সিপিএমের তল্পিবাহক হবে না, তা পরিষ্কার। রবিবারের ব্রিগেডে আবার কোনও ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি করে বসলো নাতো সিপিএম? যার খেসারত গুনতে হবে বাঙালিকে। তবে কোনদিনই কোনও ঘটনার ব্যাখ্যায় সিপিএমের যুক্তির অভাব হয় না। টুম্পা সোনাতেও হয়নি, ভাইজানেও নেই। আবার ১৯৮৮ সালের জুনেও যুক্তির অভাব হয়নি, যখন শহিদ মিনারের মঞ্চে জ্যোতি বসু হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়েছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ি, রাজীব গাঁধির সঙ্গে। আসলে পরীক্ষায় ফেল করলে এমন অনেক যুক্তিতর্ক লাগে। জিতলে ওসব দরকার হয় না। 


তবে অনেক সময় পাল্টা যুক্তির মুখেও পড়তে হয়। বাংলা থেকে বিতাড়নের কারণ ব্যাখ্যা করতে যুক্তি দেখিয়েছিলেন তসলিমা নাসরিনও। টুইটে লিখেছিলেন, 'পঞ্চায়েত ভোটে সংখ্যালঘু ভোট পেতেই আমাকে তাড়ানো হয়েছিল।' আবার দলকে বাংলার ক্ষমতার কুর্সি থেকে বিতাড়নের হাত থেকে বাঁচানোর যুক্তি খাড়া করার অপরাধে, তাড়ানো হয়েছিল সয়ফুদ্দিন চৌধুরীকে। তাঁকে কেন বিতাড়ন করা হচ্ছে না, প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সুভাষ চক্রবর্তী। 

২৮ ফেব্রুয়ারির ব্রিগেডেও এমন অনেক যুক্তি তর্কের অবতারণা করলেন আলিমুদ্দিন কর্তারা। সেসব যুক্তি শুনে চোখ কপালে উঠলো তসলিমা নাসরিনের। আবার অলক্ষ্যে থেকেই হয়ত সেসব শুনে মুচকি হাসলেন সয়ফুদ্দিন চৌধুরী, সুভাষ চক্রবর্তীরা।

মন্তব্যসমূহ