বেহালার দিন প্রতিদিন হোলি বিশেষ কাজল ভট্টাচার্যের কলমে - পলাশবিদায়

 হোলি বিশেষ 


পলাশবিদায় 




 কাজল ভট্টাচার্য 

একষট্টির পলাশ। তেইশের সুন্দরী।
পলাশকে সুন্দরী মনে করিয়ে দিয়ে গেলো- 'একষট্টির গাছে পলাশ ধরতে নেই।' সেদিন লজ্জায় আরও রাঙা হয়েছিল পলাশ। 
পলাশ মানেই তো আগুন। 
গতবসন্তে জ্বলেছে। এবারেও জ্বলছে। ভেতরের আগুন এভাবেই উগরে দেয় পলাশ। যেদিন তা পারবে না, সেটাই হয়তো শেষদিন পলাশের। নিজের জঠরে লুকিয়ে রাখা আগুনে নিজেই জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাবে। নিঃশব্দে নিভৃতে। দুনিয়ার কেউ সেকথা জানতে পারবে না। আবার কোনও বসন্ত সমাগমে কেউ হয়তো খেয়াল করবে, পলাশ মারা গেছে। 
এতদিন সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিলো। সুন্দরীও আপনমনে পলাশ কুড়োতো। তারপর সেই পলাশকে ঢুকিয়ে রাখতো নিজের বুকের ভাঁজে। ভরদুপুরে জড়িয়ে ধরতো সেই বৃদ্ধ পলাশকে। চেপে ধরতো তার নরম বুকে। পলাশের গায়ে পাগলের মতো এঁকে দিতো অজস্র চুমু। 
- 'তুমি তো জলই খাও না,' বলতো সুন্দরী। 'আমার ভেঁজা ঠোঁট থেকেই গলা ভিজিয়ে নাও পলাশ।'
সুন্দরীর উষ্ণতায় যেন নড়েচড়ে উঠতো পলাশ। সেই সকাল থেকেই সুন্দরীর পথ চেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতো সে। 
পলাশের বাহার দেখে কে! 
ফিবছর বসন্ত এসেই নিজে হাতে সাজিয়ে দিতো পলাশকে। একষট্টির পলাশের সেই আগুনে রূপ যে দেখেছে, সেই মজেছে। বছরের পর বছর, গত একষট্টিবছর ধরে এমনটাই চলে এসছে। কবে যে যৌবন বিদায় জানিয়েছে, তা টের পায়নি পলাশ। শরীর মনে সে তখনও একুশের। একুশটা যে একষট্টি হয়েছে, সেদিন সেকথাই মনে করিয়ে দিয়ে গেলো সুন্দরী। 
সেদিনও আর পাঁচটা দিনের মতোই গুটিগুটি পায়ে এসে হাজির সুন্দরী। এসেই ঝাঁপিয়ে পড়লো পলাশের বুকে। সেদিন আর চুমু না, মুখ গুঁজে রইলো। নোনা জলে ভিজে জবজবে হয়ে গেলো পলাশের সারা শরীর। টপ করে এক পলাশ ফুল খসে পড়লো সুন্দরীর মাথায়। কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই সুন্দরীর। হতভম্ব পলাশ- হলোটা কী?
সন্ধ্যা নামলো। সেদিন আর কিছুতেই বাড়ি ফিরতে চায় না সুন্দরী। দূরে শেয়ালের ডাক। কুকুরগুলো দলবেঁধে সমানে চেঁচিয়ে চলেছে। ঠিক যেন কাউকে সাবধান করছে- আর একটি পাও এগিয়ো না।
কেঁপে ওঠে পলাশের বুক। শেষপর্যন্ত যেন কোনও বিপদ আপদে না পড়ে সুন্দরী। জোনাকিরা ছুটে এসে আলো জ্বালালো। খানিকটা ফিকে হলো ঘন বন্য অন্ধকার। শেকড় থেকে প্রাণপণে শক্তিসঞ্চয় করে এবার প্রবলভাবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো বৃদ্ধ পলাশ। অভিমানী সুন্দরীর বাঁধন শিথিল হলো। জলভরা চোখে একবার তাকালো সেই গাছের দিকে। পায়ের কাছে পড়ে থাকা পলাশটা তুলে গুঁজে রাখলো বুকে।
- 'তোমার কাছে আর কোনদিন আসবো না পলাশ,' বললো সুন্দরী। পলাশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হনহন করে এগিয়ে গেলো সে। জোনাকিরা তাকে পথ দেখালো। একসময় অন্ধকারে হারিয়ে গেলো সুন্দরী। আর হারিয়ে যাওয়ার আগে পথে ফেলে দিয়ে গেলো পরম নিশ্চিন্তে বুকের আশ্রয়ে থাকা পলাশকে। কেউ তা টের পেলো না। 
পরদিন বসন্ত উৎসব। সবাই ছুটলো পলাশের কাছে। অবাক চোখে দেখলো, পলাশের ডালে আর আগুন নেই। সব আগুন ঝরে পড়েছে পলাশতলায়। সেই পলাশফুলগুলো যেন ভয়ানক লাল। তাজা রক্তের মতো। কেউ জানলো না, যাওয়ার সময় সুন্দরী পলাশকে রাঙিয়ে দিয়ে গেছে। 
শূন্য পলাশ, ভীষণ একা দাঁড়িয়ে।

 চিত্র সৌজন্যঃ সংগৃহীত 

মন্তব্যসমূহ